dannews24.com | logo

৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কারেন্ট সুদে আটকা পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছে বগুড়ার অভাবী মানুষ

প্রকাশিত : নভেম্বর ১০, ২০২০, ২০:৩৪

কারেন্ট সুদে আটকা পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছে বগুড়ার অভাবী মানুষ

 এফ শাহজাহানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন :
এফ শাহজাহান : কারেন্ট জালে যেভাবে মাছ আটকা পড়ে, ঠিক সেভাবেই মানুষ ধরার ফাঁদ বানিয়েছে বগুড়ার মহাস্থানের দাদন ব্যবসায়ী মহাজনরা।তাদের সেই মানুষ ধরার ফাঁদের নাম কারেন্ট সুদ। সেই কারেন্ট সুদের ফাঁদে আটকা পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন অভাবী মানুষেরা। জুয়ার নেশার মতই কারেন্ট সুদের নেশা মানুষকে পথে বসাচ্ছে। একবার কেউ কারেন্ট সুদের ফাঁদে পড়লে তিনি সর্বশান্ত না হওয়া পর্যন্ত আর বের হতে পারেন না। এমনই এক মগের মুল্লুক কারেন্ট সুদের কারবারীদের স্বর্গরাজ্য মহাস্থানের চালচিত্র উঠে এসেছে এফ শাহজাহানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
কারেন্ট সুদ কাকে বলে ?
কারেন্ট শক লাগলে যেমন মানুষের সব রক্ত চুষে শেষ না করা পর্যন্ত ছাড়ে না,ঠিক তেমনি কারেন্ট সুদ মানুষকে সর্ব শান্ত না করে ছাড়ে না । এজন্যই এর নাম কারেন্ট সুদ। কারেন্ট সুদ মানে হাতে নাতে সুদ। ১ সপ্তাহ, ১ মাস কিংবা ১ বছর পর সুদ দিবেন তা নয়। সকালে টাকা নিবেন,সন্ধ্যায় সুদ দিবেন। তারই নাম কারেন্ট সুদ। ১ হাজার টাকার দৈনিক সুদ ৫০ টাকা। তার মানে সকালে ১ হাজার টাকা লোন নিলে সন্ধ্যায় সুদ দিতে হয় ৫০ টাকা। আপনি আসল ফেরত না দিলেও দৈনিক সুদের টাকা যে কোন ভাবেই শোধ করতে হয়। তা না হলে প্রতিদিন আসলের সঙ্গে যোগ হবে প্রতি হাজারে ৫০ টাকা।পরদিন এই সুদআসলের আবার সুদ দিতে হবে। এই চক্রবৃদ্ধির কারেন্ট সুদের ফাঁদে একবার কেউ পড়লে সে আর বের হতে পারে না। কারেন্টের মত আটকে ধরে এই সুদের নেশা।এজন্যই এলাকার মানুষ আদর করে এই সুদের নাম নাম দিয়েছেন কারেন্ট সুদ।
কারেন্ট সুদের ব্যাবসায়ী কারা ?
কারেন্ট সুদের ব্যবসায়ীরা সবাই সুদখোর কোটিপতি। দেহব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ডিজিটাল সাংবাদিকরাও এই কারেন্ট সুদের কারবারে জড়িত।এরা বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান ও গড় মহাস্থান এলাকায় নামে বে নামে দাদন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।বগুড়ার ১২টি উপজেলাতেই এই কারেন্ট সুদের কারবারিদের নেটওয়ার্ক আছে। এই সিন্ডিকেটের এতোটাই প্রভাব যে সেখানে অন্যকারো নাক গলানোর কোন সুযোগ নেই।তাই প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের নেতা ফেতা সবাইকে তারা ম্যানেজ করে চলেন। কাজেই কথা বলার কেউ নেই। মানুষকে সর্বশান্ত করারও কোন প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। ভুক্তভোগীরা কেউ কোন কথাই বলতে চান না। কারেন্ট সুদের ফাঁদে পড়ে কয়েকজন আত্মহত্যা করলেও সেই তথ্য চেপে যাচ্ছেন স্বজনরা।ফলে কারেন্ট সুদের শেকড়ের তালাশ করতে গিয়ে সহজেই সব কিছু পাওয়া যায় না।
বগুড়ার শিবগঞ্জ এলাকার পুন্ড্র বর্ধন নামে পরিচিত ঐতিহাসিক মহাস্থান গড়। প্রতিদিন এখানে দেশ বিদেশ থেকে পর্যটকেরা বেড়াতে আসে এবং এখানকার সুনাম বহু দিনের। এখানকার মুখ চেনা কিছু, মুখোশধারী বিভিন্ন সংগঠনের নামে বানিয়েছেন কারেন্ট সুদের আড়ত। তারা নিজেরা এবং পরিবারের সদস্যদের নাম দিয়ে সমাজের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে সুদের ব্যবসা। তাদের সুদের হার প্রতি হাজারে প্রতিদিন ৫০ টাকা। এক দিন বা এক সপ্তাহ কেউ ঐ সুদের টাকা না দিতে পারলে মুল টাকার সাথে সুদের টাকা যোগ হয়ে সুদের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
যেভাবে চলে কারেন্ট সুদের কারবার
কারেন্ট সুদের নিয়মকানুনও একেবারে ফোর ফোরটি কারেন্টের মত। কেউ মাসিক হারে তাদের কাছে থেকে সুদের টাকা নিতে গেলে তাকে দিতে হবে ফাঁকা চেক এবং ২০০ থেকে ৩০০ টাকার ননজুডিসিয়াল ষ্ট্যাম্প। পরবর্তীতে যাতে ঐসব স্ট্যাম্পে নিজের ইচ্ছামত টাকার পরিমান বসিয়ে স্ব স্ব ব্যাংক থেকে চেক ডিজ অনার করে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
কারেন্ট সুদের কেসস্টাডি
সদরের ধাওয়া কোলা গ্রামের আব্দুল হামিদ নামে একজন এনজিও কর্মী মহাস্থান এলাকার কথিত দুই সাংবাদিকের কাছে থেকে ৪০ হাজার টাকা সুদে নিয়ে একটি সাদা চেক, ননজুডিসিয়াল সাদা ষ্ট্যাম্প ও নতুন একটি বাজাজ সিটি মোটর সাইকেল বন্দক রাখেন।
দুই মাসে বিশ হাজার সুদের টাকা পরিশোধ করে বাঁকী দুই মাসে সুদের টাকা দিতে না পারায় মোটর সাইকেলটি ঐ সাদা ষ্ট্যামে তাদের একজনের নামে লিখে নেয় এবং সাদা চেকে ৫লক্ষ টাকা বসিয়ে কোর্টে মামলা দায়ের করে। মামলায় তার সাজা হয় এবং ৫ লক্ষ টাকার ৫০ পার্সেন্ট কোর্টে জমা দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। এ সংবাদ পেয়ে হামিদের পরিবার এখন দিশেহারা হয়ে বাড়ী ঘর ছেড়ে ভয়ে অন্যত্র পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
সঞ্চয় সমিতির আড়ালে কারেন্ট সুদের ব্যবসা
মহাস্থানের দাদন ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে সর্বশান্ত করছে নানা উপায়ে। এলাকায় বিভিন্ন নামে বেনামে সঞ্চয় সমিতি গড়ে তুলে তার আড়ালে কারেন্ট সুদের ব্যবসা করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে মোটা অংকের লাভ প্রদানের কথা বলে সঞ্চয় রাখতে উদবুদ্ধু করে।
টাকার হিসাব,হিসাবের টাকা
দৈনিক সঞ্চয় জমাদানের ভিত্তিতে এলাকার ব্যবসায়ীদের এক বছর মেয়াদী সদস্য করে নিয়ে তাদের কাছ থেকে দৈনিক ১০/২০/৫০/১০০/২০০/৫০০/ টাকা হারে সঞ্চয় উঠানো হয়। সেই টাকা আবার ব্যবসায়ী বা অন্যান্য ব্যক্তিদের মাঝে কারেন্ট সুদে প্রদান করা হয়। ৫০ টাকা হারে সঞ্চয় রাখলে বছর শেষে সঞ্চয়ী সদস্যদের টাকা জমা হয় ১৬ হাজার টাকা । সঞ্চয়কারীদের প্রদান করা হয় ২০ হাজার টাকা। পরবর্তীতে সঞ্চয়ী সদস্যদের জমার টাকা ফিরত দিতে না পারলে তারা এলাকা থেকে পলিয়ে যায়।
এভাবে সর্বশান্ত হয়ে পড়ে জমা রাখা সঞ্চয়ী সদস্যগণ। এভাবে কয়েক বছরে সাধারণ মানুষের কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পলাতক রয়েছে অনেকেই। তবু এদের দৌরাত্য বন্ধ হচ্ছে না।
কারেন্ট সুদে সংসার ভেঙ্গে যাওয়া এবং সুদের বোঝা টানতে না পেরে আত্মহত্যার মত কয়েকটি হৃদয়বিদারক ঘটনাও আছে। এই ঘটনাগুলোর তথ্য জানার জন্য অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।






অফিস: হোল্ডিং#৩৫৯,রোড# ৮/২ মধ‍্য সরদারপাড়া, দুপচাঁচিয়া, বগুড়া।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: মোছাব্বর হাসান মুসা। 01711366298/01812550877 mushanews2011@gmail.com

নির্বাহী সম্পাদক
ইমরানুল হাসান (বি এ অনার্স) ম‍্যানেজমেন্ট।

 

বার্তা সম্পাদক: মো:জাকারিয়া হাসান। 01796032336

মহিলা সম্পাদিকা: মোনিকা আক্তার মালা। ( বিএ অর্নাস) রাষ্ট্রবিজ্ঞান।