dannews24.com | logo

৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

জমিদার পুত্র থেকে ‘কমরেড’ অমল সেন

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৮, ২০২১, ২১:৩৪

জমিদার পুত্র থেকে ‘কমরেড’ অমল সেন

এ,এইচ,এম,জুয়েল খান: জমিদার পুত্র অমল সেন। যিনি জমিদারি ছেড়ে কমিউনিস্ট আদর্শে দীক্ষিত হয়ে নিজেকে শ্রেণিচুত্যের মাধ্যমে সর্বহারার কাঁতারে দাড় করিয়েছিলেন। সামন্তবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রথম যেই আঘাত করেছিলেন তা তিনি প্রথমে নিজের ওপরই করেছিলেন। বিদ্রোহ করেছিলেন নিজ পিতার জমিদারিত্বের ওপর । চিন্তা করা যায়- কতটা উন্মাদ আর আপনাদের ভাষায় কতটা ‘বোকা’ এবং অতি বিপ্লবী না হলে সেটি কি তিনি করতে পারতেন? তিনি যেই আদর্শ ধারণ করেছিলেন; সেই আদর্শ আগে নিজের ওপর প্রয়োগ করেছিলেন। যেটা তার ব্যক্তি জীবনকে পাল্টে দিয়েছিল।
জমিদার বাবার আল্লাদে বড় হওয়া ছেলে হিসেবে ভোগ বিলাসে কোথায় তার ডুবে থাকার কথা ছিল। অথচ তার শেষ শয্যায় চিকিৎসার টাকা জোগান দিতে গিয়ে তার পরিবারের লোক জন কে হিমসিম খেতে হয়েছে। চিন্তা করা যায়- কতটা উন্মাদ, কতটা স্বার্থপর ছিলেন তিনি! (আপনাদের বিচারে) তিনি তখন কার সময়ে বড্ড উন্মাদ। তার বাবা চাচা পরিবারের সদস্যদের ভাষায় ‘বোকা’ পাগল ছিলেন বলেই তিনি সেটা করতে পেরেছিলেন। জমিদার পুত্র অমল সেন থেকে কমরেড অমল সেন হয়েছিলেন এভাবেই। তাই তিনি এখন একটি আদর্শের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
উপমহাদেশের ১৯ শতকের গনগনে সময়ে যেই বিখ্যাত বিপ্লবীগুলোর নাম জানা যাবে- ইতিহাসে তার মধ্যে সূর্য সেন, নির্মল সেন, কল্পনা দত্ত, প্রিতি লতা, ইলামিত্র, অমল সেন, মনি সিংহ নামগুলো জলজল করে উঠবে। অমল সেনের মৃত্যুর মধ্যদিয়েই পূর্ব বাংলার এক সময়ের ঐতিহ্য; বিপ্লবীদের তীর্থ ভূমি খ্যাত এই পূর্ব্য বাংলা- সেই ঐতিহ্যরও সমাপ্তি হয়েছিল। কেননা কমিউনিস্ট রাজনীতির মতাদর্শ, আদর্শ, স্লোগানগুলো একই থাকলেও, পতাকার রঙ লাল থাকলেও- কমরেড অমল সেসের মতো দ্বিতীয় কাউকে এখনো পাইনি এই দূর্ভাগা জাতি। যা পেয়েছে তা হল একই পোশাকে অসংখ্য হিপোক্রেটদের। বাস্তবতার নির্মম পরিহাস যুগে যুগে এই হিপোক্রেটদের পাল্লায় ভারী থাকে।এই হিপোক্রেটদের পাল্লায় পরে কত না মেধাবী ত্বরুণ তাদের সোনালী সময়কে উজাড় করে, জীবনকে বাজী রেখে, আদর্শের পতাকা হাতে নিয়ে- দিক থেকে দিগন্তে ছুটেছে।
আবার তারা কখনো রক্ত দিয়েছে। শহীদ হয়েছে।কিন্তু সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাক্তি স্বার্থ চরিত্রার্থ করেছে নানা কৌশলের নামে। রক্ত গেছে, সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার পতন হয়েছে,নতুন সরকার এসেছে,শোষক বদলিয়েছে শোষোনে চরিত্র বদলায় নি। তাই বিপ্লব আসেনি। কিছু ব্যাক্তি বর্গের জীবন মান পরিবর্তন হয়েছে।কিন্তু কসিমুদ্দির (রুপক অর্থে) ছেলেরা বার বার জীবন দিয়েছে, হাজার হাজার ছররা বুলেট টিয়ার সেলের বিষাক্ত ধোয়াই জীর্ন হওয়া ফুস্ফুস, পুলিশের লাঠি চার্য বেইনেট আর বুটের তলাই পিষ্ট হওয়া ঐ হাজার হাজার ত্বরুন বিপ্লবীরা বার বার প্রতারিত হয়েছে উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের দ্বারা। অবেলাই অনেক স্বপ্ন বার বার চুরি হয়েছে, বিপ্লব আসে নি। বিপ্লব চেয়েছিল রক্ত, রক্ত দিয়েছে শ্রম চেয়েছিল শ্রম দিয়েছে, বিপ্লবী কবি সুকান্তের কবিতার লাইনের মত বার বার রাজপথে আগ্নিওগিরির লাভার মত ১৮ নেমেছে কিন্তু বিপ্লব আসে নি। কৌশলের নামে বারবার কিছু ব্যাক্তি স্বার্থ সিদ্ধি হয়েছে ব্যাস এই তো।
কিন্তু বিপ্লব তো তা চাই নি, কমরেড অমল সেন এবং যুগে যুগে ১৮ নেমে আসা রাজপথ চেয়েছিল, ফসলের জমি হবার কথা ছিল কৃষকের। কারখানা হবার কথা ছিল শ্রমিকের। ক্যাম্পাসে আন্দোলন না বরং গবেষণা করে নতুন কিছু উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা থাকার কথা ছিল ছাত্রদের। অথচ সেই ক্যাম্পাসে এখনো আন্দোলন করতে হয় শিক্ষার অধিকার নিয়ে। যেই সূর্য্যের আলো সমস্ত কোনায় সমানভাবে পড়ার কথা ছিল- কিন্তু বিপ্লব হয়নি, সেই আলো বারবার কিছু ব্যক্তি নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। আদর্শ, স্বপ্ন, রাজপথ, মিটিং’র মাইক কলেজের স্ট্রাইক, বুলেটে জীবন দিয়ে হওয়া শহীদ; সব কিছুই চুরি হয়ে যায়। এখন রাজনীতিতে দেখি ভাঙা সুটকেস নিয়ে কোটি পতি হতে। কমরেড অমল সেনেরা জমিদার থেকে সর্বহারা হয়েছিলেন। তারা আদর্শ ধারণ করে শ্রেণিচুত্য হয়েছিলেন। কিন্তু আজ দেখি তার ঠিক উল্টো।
লেখা বেশি দীর্ঘায়িত করবনা, মনের মধ্যে কাল বৈশাখির তুফান শুধু বলবো, আজকের এই বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কমরেড অমল সেন এর আকুতি ছিল বিপ্লব আসবেই । তিনি তার নিজ জীবন দশায় বহু বার বিপ্লবের দাড়প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছুতে পারে নি, তবুও তিনি মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত বিপ্লব কে ধারন করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আমার জীবন দশায় না হলেও বিংশ শতাব্দীর উচ্চ পজিবাদ বিকশিত দুনিয়ায় বিপ্লবে এর প্রাসংগিকতা অনেক জোরালো।বিপ্লব খুব কাছাকাছি। সারা বিশ্বের যেই পরিবর্তন এর হাওয়া সেই হাওয়াই এই বাংলাদেশেও কাস্তে হাতুড়ির লাল পতাকা উড়বে। রাষ্ট্র ক্ষমতা না বিপ্লব। বিপ্লব মানে শ্রেনী হীন সমাজ, শোষনহীন অর্থনীতি, সেদিন সূর্য সমান ভাবে ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে আলো ছড়াবে। ক্ষেত হবে কৃষকের, জল হবে জেলেদের, কারখানা হবে শ্রমিকের আর রাজপথে কেও জীবন দিতে হবে না ছোট শিশুর মিষ্টি হাসিতে সারা দেশ হাসবে।
আজীবন বিপ্লবী কমরেড অমল সেনের সেই স্বপ্ন এখন এই প্রজন্মের হাতে। কমরেড অমল সেনের মৃত্য বা জন্ম দিবসে ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়ার পাশাপাশি বিপ্লব কে এগিয়ে নিয়ে যাবার দৃহ প্রত্যয় নিতে হবে। আদর্শের খলশ নয় পুরোপুরি আদর্শিক হতে হবে। ভন্ডামি না, আমরা যা মুখে বলি তা ব্যাক্তি জীবনে দৃশ্যমান থাকতে হবে।
আমরা যারা আদর্শের রঙ মাখিয়ে চেতনা কেনা-বেচার দোকান খুলে বসেছি, তারা নিজেদের পন্ডিত ও মহান ভাবলেও জনগণ তা মনে করে না। জনগন যদি মনেই করতো তাহলে পার্টি বা সংগঠন গুলো দিনে দিনে শুকিয়ে যাচ্ছে কেন?কেনই বা জন বিছিন্নের পথে কমিউনিস্ট পার্টি গুলো। অথচ এই পার্টিই জনগনের পার্টি হবার কথা ছিল। জনগন কে বুঝতে হবে, জনগনের জন্য লড়াই করার আগে নিজেকে চিনতে হবে এবং প্রস্তুত করতে হবে আপনি লড়ায়ে কতদর টিকে থাকতে পারবেন।অনেক নেতারা গোপেনে বলেন জনগন তো বোঝে না, আমি বলি জনগন বোঝে সবই। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে আদর্শিক হয়, সততা এবং সত্য নিয়ে চলি, জনগন প্রপথমে আমাদের বোঝার চেষ্টা করবে, পরবর্তীতে আমাদের সাথে স্রোত তৈরী করবে। যেই স্রোত সব কিছু ভেংগে দিবে সুনামির মত। তাই প্রথম কাজ টা আস্তা অর্জনের। আমরা কি পেরেছি আস্থা অর্জন করতে বা অর্জন করে ধরে রাখতে?
কমরেড অমল সেন আজ পর্যন্ত বাংলার লাল তারা বনে যাওয়া আদর্শের প্রতীক ঠিক এই কারনেই। কারন জনগনের কাছে কমরেড অমল সেন সেই আস্থা ভাজন একজন কমরেড ছিলেন। তিনি সেই নেতৃত্ব ছিলেন, যিনি কখনো আপোষ করেন নি। তাই তার সংগ্রামকে সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে আমরা যারা কমরেড অমল সেনের উত্তরসুরি হিসাবে নিজেদের দাবী করি, আমাদের ব্যক্তি জীবনে আগে সেই আদর্শের প্রয়োগ ঘটাতে হবে।আপোষ হীন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, সাথে কৌশলের নামে প্রক্ষান্তরে সুবিধাবাদী মনোভাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।আমিত্বের আসক্তি কে ভেংগে আমরা তে আসতে হবে। ব্যাক্তি বা পার্টি না জনগন কে নিয়েই বড় ক্যানভাসে আকতে হবে।তবেই আস্থা আসবে জনমনে। যদি কমরেড অমল সেনের উত্তরসুরিরা ইতিহাস সৃষ্টি করে, তবে বুঝতে হবে- একজন আদর্শিক প্রতীক হিসেবে কমরেড অমল সেন তার সংগ্রামী জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট হবেন।
একজন আদর্শিক মানুষ সবসময় চায়- তার পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাসে তাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাক। স্ট্যাচু যদি অন্য কারও হয়, তবে সেটাই হবে সেই আদর্শিক প্রতীকের একমাত্র তৃপ্তির বিষয় । বাংলাদেশে কখনও কি আসবে কমরেড অমল সেনের পরবর্তী আদর্শিক প্রতীক? আরেক জন কমরেড অমল সেন কেও কি হতে পারবে,?
আমার চাওয়া একজন নয় এক গুচ্ছু অমল সেন হোক।
বাংলার সব ফুলবাগানে লালচে গোলাপ ফুটুক
বাংলার সব তরুন প্রজন্ম কমরেড অমল সেন হয়ে উঠুক।
আমি আশাবাদী আসবে। আসতেই হবে। যেদিন আসবে- সেদিন কমরেড অমল সেনের আদর্শ তথা কমিউনিস্ট বিপ্লব অবসম্ভাবী।
লেখক: এ,এইচ,এম,জুয়েল খান।
সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী,রাজশাহী মহানগর।






অফিস: হোল্ডিং#৩৫৯,রোড# ৮/২ মধ‍্য সরদারপাড়া, দুপচাঁচিয়া, বগুড়া।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: মোছাব্বর হাসান মুসা। 01711366298/01812550877 mushanews2011@gmail.com

নির্বাহী সম্পাদক
ইমরানুল হাসান (বি এ অনার্স) ম‍্যানেজমেন্ট।

 

বার্তা সম্পাদক: মো:জাকারিয়া হাসান। 01796032336

মহিলা সম্পাদিকা: মোনিকা আক্তার মালা। ( বিএ অর্নাস) রাষ্ট্রবিজ্ঞান।